
মুহাঃ মোশাররফ হোসেন:
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্ব জ্বালানি সংকটের কবলে আছে। এই জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের দেশে তেল ও বিদ্যুতের উপর প্রভাব পড়েছে, সারাদেশে জ্বালানি তেলের জন্য যেমন প্রভাব পড়েছে তেমনি চারিদিকে তীব্র সংকটের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে ভোগান্তি খাচ্ছে সাধারণ জনগণ সাথে আছে রোদ ও উত্তাপ আতংক। এ যেন প্রকৃতিতে আগুন লেগেছে আর বাতাস সে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো পৃথিবীতে। চলমান বিদ্যুৎ সংকট ও তীব্র তাপ প্রবাহে ঘরে বাহিরে কোথাও স্বস্তি নেই। কর্মে বের হওয়া ঘামে মানুষগুলোর একাকার তাপে শরীরে ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে। তীব্র তাপ প্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। গরমজনিত কারনে হাসপাতালে অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ। হিটস্ট্রোকে অনেক লোক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এই গরমে স্কুলে যেতে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে এ যেন কেয়ামতের আলামত। দিন দিন শান্তিময় আবাহ, সুজলা, সুফলা, সবুজ, শ্যামল ছায়া সুনিবিড় বাংলাদেশ হারিয়ে যাচ্ছে। এমন একদিন ছিল, সারা গ্রাম হেঁটে এলেও কোনো বিল্ডিং ঘর পাওয়া যেত না। অবস্থ্যসম্পন্ন গৃহস্থবাড়িতে দোচালা টিনের অথবা অঞ্চলভিত্তিক মাটির ঘর চোখে পড়ত। গরমের সময় হালকা ঠাণ্ডা আমেজ ও শীতের সময় হালকা গরম আমেজ পাওয়া যেত, বিশেষ করে মাটির ঘরগুলোতে।
এখন সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে উন্নত প্রযুক্তির বদৌলতে মানুষের জীবনযাপনের উন্নত হয়েছে। আগেকার দিনে মানুষের ঘুম ভাঙতো পাখ-পাখালির কলরবে। সকালে গোয়াল ঘরে বেঁধে রাখা গাভীর বাছুরটির চিৎকারে। এখন মানুষের ঘুম ভাঙছে বিদ্যুতের লোডসেডিং এ আর ভোর হচ্ছে সকাল ১০টায়। উন্নত যান্ত্রিকতার কবলে পড়ে মানুষের মন ও মানবতাকে হারিয়ে গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ একেবারেই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে বিলে গরু ছেড়ে রাস্তার পাশে গাছের ছায়া চলে গরু পাহারা দেওয়া সেই রাখালের বাঁশির সুর। এখন আর গ্রামীণ রাস্তার দু’পাশে তেমন গাছ চোখে পড়ে না। প্রতি বছর কারণে-অকারণে গাছ কাটা হলেও নতুন করে গাছ রোপণ না করায় বাড়ছে তাপ প্রবাহ । একটি গাছের সমান চারটি এসির শীতল হাওয়া। গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে দেশে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। দখলদারদের কবলে দেশের নদীগুলো হারাচ্ছে তার যৌবন যার ফলশ্রুতিতে শীতল হাওয়া পাওয়া যায় না। যার কারণে প্রচুর গরমের সৃষ্টি হয়েছে তাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষসহ সব স্তরের জনজীবন। বিশেষজ্ঞদের মতে পরিবেশ ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবুজের কোন বিকল্প নাই। বাংলাদেশ সরকার বৃক্ষ রোপনের উদ্বুদ্ধ করলেও বন বিভাগ মেতে উঠেছে গাছ কাটতে অথচ গত দুই এক বছরে তারা একটি বৃক্ষরোপণ করেনি শুধু মাত্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে। বাংলাদেশ ফেসিস্ট সরকারের আমলে ছাত্রলীগ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫ লক্ষ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। অনেক গাছ তারা রোপণ করেছেও এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার ছিল। তবে যে তাপ প্রবাহে চলছে তাতে এই গাছগুলোকে বাঁচানো খুব দায় হবে। মাটি রোদের তাপে গরম হয়ে আছে মোটেও তোষ নেই এই সময়ে গাছ লাগান উপযোগী নয়। বর্ষার মৌসুম ছাড়া গাছ লাগালে তা টিকে না। এই তাপের কারণে যদি আল্লাহর নিয়ামতের বৃষ্টি হয় তাহলে এই গাছ টিকে রাখা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে মানবসেবার অন্তরালে চলছে দেশে অনৈতিক কাজ যা রীতিমতো নেট দুনিয়ায় ভাইরাল খবর। এছাড়াও দেশের সড়কগুলোতে দিন দিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সম্প্রতি মিল্টন সমাদ্দার নামে এক ব্যক্তি বৃদ্ধাশ্রম করে মানবিক কাজ করে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। মানবতার মুখোশের আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজের সম্রাজ্য। তার নামে অনেক অভিযোগ যদিও তিনি সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় দেশসহ সারা পৃথিবীটা ছেয়ে গেছে অন্যায় ব্যবিচারে। মানুষের কৃতবর্ম এতোটাই ভয়ংকর যা ভাষায় প্রকাশ করাও লজ্জা পেতে হয়। অবশ্য মাঝেমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফুটে উঠে।
হাদিসে উল্ল্যেখ আছে পৃথিবীর জলে এবং স্থলে যাহা কিছু ঘটে সব-বিছুই মানুষের কৃত-কর্মের ফল (পবিত্র আল-কুর-আন সুরা আর-রুম: ৪১, সুরা আশ শুরা: ৩০)। তারই ধারাবাহিতায় ভালো নেই ধরিত্র এবং মানুষ। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই বিশ্ব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ধ্বংসের দিকে। যার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে। যার নমুনা বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলে পড়তে হয় আমাদের। এতে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। দুনিয়ার তীব্র
গরম জাহান্নামের আগুনের আজাবের নমুনা মাত্র। ওয়াজ-নসিয়াতে আলেম উলামারা জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে বলেছেন পৃথিবীতে মানুষ যখন অন্যায় অত্যাচার বেশি করবে তখন জাহান্নামের সামান্য হাওয়া দুনিয়াই ছেড়ে দিবেন যাতে করে তারা অনুধাবন করতে পারে। পবিত্র আল-কোরআন ও হাদিসে জাহান্নামের আগুনের উত্তাপের সামান্য কিছু বিবরণ দেয়া হলো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটা তো লেলিহান অগ্নি, যা গায়ের চামড়া খসিয়ে দেবে। (সুরা মা-আরিজঃ ১৫-১৬)। অন্য আয়াতে অল্লাহ বলেন, ‘তাদের মাথার ওপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি, যা দিয়ে তাদের চামড়া ও পেটের ভেতর যা আছে তা বিগলিত করা হবে, (সুরা হলঃ ১৯-২০)।
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘যারা আমার আয়াত প্রত্যাখ্যান করে, আমি তাদের অগ্নিতে দগ্ধ করবই। যখনই তাদের চামড়া দগ্ধ হবে তখনই এর স্থানে নতুন চামড়া সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে পারে।’ (সুরা নিসা: ৫৬)।
অন্যদিকে হাদিসে এসেছে দুনিয়ার আগুন থেকে জাহান্নামের আগুনের তেজ ৭০ গুন বেশি হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমাদের দুনিয়ার আগুন, জাহান্নামের আগুনের ৭০ ভাগের ১ ভাগ। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, এটা কি যথেষ্ট নয়? তিনি উত্তরে বলেন: এর সাথে আরো ৬৯ গুন যোগ করা হবে এবং প্রত্যেকটির গুণ এ আগুনের মতো। (বুখারি, ৩২৬৫ ও মুসলিম, ২৮৪৩)।
আমরা জাহান্নামের সামান্য এই একগুন আগুন সহ্য করতে পারছিনা অথচ এর চেয়ে আরো ৬৯ মতান্তরে ৭০গুন আগুন কেমনে সহ্য করবো। সুতরাং তীব্র গরম দ্বারা কেয়ামত দিবসের কঠিন অবস্থা ও জাহান্নামের কঠিন শাস্তির বিষয়টি সহজে অনুমান করা যায়। তাই আসুন, তীব্র এই গরমে কেয়ামত দিবসের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে নেক আমলের আসায় ভাল কর্ম করি এবং জীবনের যাবতীয় গুনাহ থেকে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমাপ্রার্থনা করি। ইবাদত বন্দেগীতে মনোযোগী হই এবং অম্লল্লাহর সব বিধিনিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলার চেষ্টা করি।
লেখকঃ মুহা. মোশাররফ হোসেন, লেখক, সাংবাদিক ও জনপ্রিয় অনলাইন মিডিয়া নিউজবিডি জার্নালিস্ট২৪ এর প্রকাশক।



